আমার বন্দি জীবন মুক্তি দিল লক্ষ্মী আপু

আমার একটা বড় বোন আছে। এ দুই সন্তান নিয়ে আমাদের বাবা-মার সংসার। আমার বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা একজন সরকারি শিক্ষিকা। আমার বাবা-মা দুজনই তাদের কাজকর্ম নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে। যার কারণে আমাকে তারা সময় দিতে পারতেন না। যার ফলে আমার বড্ড একা লাগত।

সত্যি তখন সময়গুলা কাটাতে আমার খুব কষ্ট হত। যখন আমার খেলার সাথীদের নিয়ে খেলতে যাওয়ার কথা তখন চারদেয়ালের ঘরে আটকে থাকা। শুধুমাত্র ঘর বসে বসে টিভি দেখা, পড়াশুনা করা আর গেমস খেলা। কতক্ষণ ভালো লাগে এগুলা?

আমার বড় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এ অধ্যয়নরত আছেন। তিনিও আমার মতো করে বড় হয়েছেন। সেই চারদেয়ালের ঘরের মধ্যে। বলতে গেলে নাকি আপু তার চেয়ে কঠিন অবস্থায় বড় হইছেন! শুধু পড়তেন আর টিভি দেখতেন। কিন্তু আপু আমাকে এসবের মধ্যে রাখতে চান না। আপু চাই, আমি প্রকৃতির সাথে বড় হয়। চারদেয়ালের ঘরে বড় না হয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে বড় হয়। সাথীদের সাথে আনন্দ করে বড় হই। কিন্তু বাবা-মা তা চান না। তারা ভাবেন, আমি যদি সাথীদের সাথে বসে আড্ডা দিই তাহলে আমার পড়াশুনার ক্ষতি হতে পারে।

শুধু পড়াশনা করলে, টিভি দেখলে, গেমস খেললে সবকিছু পূরণ হয় না। তারা বুঝতে চান না যে, আমাদের সাথে তাদের সময় কাটানোটা প্রয়োজন। একটা সন্তানকে যদি সব কিছু দিয়েই যদি তার বাবা-মার আদর থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সেই সন্তানই বুঝতে পারে। আসলে সন্তানদের টিভি দেখা, গেমস খেলাটা প্রয়োজন না, তাদের প্রয়োজন বাবা-মার সময় দেওয়াটা। তবে হ্যাঁ, ছোটবেলায় আমার একজন খেলার সঙ্গী ছিলেন, আর তিনি হলেন আমার আদুরের আপু। কিন্তু তার পড়াশুনার জন্যই আমাকে ছেড়ে শহরে চলে যেতে হয়। যার ফলে, আমি আবার ওই চারদেয়ালের ঘরে বন্দি হলাম। অত:পর এভাবে কেটে যায় চারটা বছর।

অবশেষে আপু বাসায় আসছেন। আপু আসার কথা শুনে আমি খুশিতে মেতে উঠলাম। আপু ফেরা মানেই সেই প্রকৃতির কাছে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া, এমনকি ঘুরতে যাওয়া ইত্যাদি।

আপু আসার খবর শুনে রাত বারোটা পর্যন্ত জেগে আছি, না হয় সাধারণত আমি এগারোটার দিকে ঘুমিয়ে যেতাম। কিন্তু এখনো আপু আসতেছে না, এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে আমার চোখ লেগে যায়, তা টেরও পেলাম না। সকালে উঠতে দেখি আপু আমার বিছানায় আমার পাশে শুয়ে আছে। দেখে তো আমি অবাক! কখন যে আপু আসল, তাও জানি না।

আমি যখন উঠতে চেষ্টা করতেছি তখনিই আপু বলে উঠল কিরে! উঠে যাচ্ছি কেন? ঘুমাবি না আমার পাশে? এখনো তো সকাল আটটা বাজে। কিন্তু আমি আপুর কথা না শুনে উঠে বসলাম এবং আপুকে জিজ্ঞেস করলাম, কবে আসলেন আপু?  আমি তো টেরও পেলাম না। আপু বলে উঠলেন আমার আসতে একটু দেরি হইছিল। এসে দেখি তুই ঘুমাচ্ছিস তাই আর ডাকি নিই। এভাবে কথা বলতে বলতে বাবা-মা রুমে হাজির। আপু আসছে এতে আমার যে কত আনন্দটা হচ্ছে মনে তা বলে বুঝাবার মতো না। আজ বাবা-মা দুজনই তাদের অসিসে যান নি।

অনেকদিন পর বাবা-মার ও আমার লক্ষ্মী আপুটার সাথে বসে সবাই এক টেবিলে খাবার খাব। কিছুক্ষণ পর খাবার শেষ করে আপুর সাথে যখন নিচে আসি তখন দেখি আমাদের বাসায় অনেক লোকজন।  সেই সাথে আমার স্কুলের সাথী সাথে তাদের বাবা-মা। তখন আপুকে জিজ্ঞেস করলাম, এসব কি আপু?  এত লোকজন কেন আসছে? তখনই আপু বলে উঠল আজকে কি জান তুমি? আজকে তোমার জন্মদিন, নিজের জন্মদিনের কথাটাও ভুলে গেছ!

আমি তো আপুর কথা শুনে সম্পূর্ণ অবাক। এর আগে তো কোনো দিন এত লোকজনকে এক করে আমার জন্মদিন পালন করে নাই। এরপর আপুকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি জানতে এসব ব্যাপারে? হুম। তাহলে বললে না কেন আমাকে? আপু বলল এটা আমার পক্ষ থেকে সারপ্রাইজ। তখন আমার আব্বু- আম্মুও নিচে চলে আসল এবং সবাইকে সাথে নিয়ে কেক কাটা হলো। সেই সময়ে আমার বাবা বললেন, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। আসলে আমরা বুঝতে চাইনি যে সন্তানদের আমাদের সময় দেওয়াটাই প্রয়োজন। তাদের সুখ দুঃখে ভাগিদার হওয়া সবচেয়ে দরকারি কর্ম।

হঠাৎ করে আব্বু মুখে এসব কথা শুনে আমার তো কান্না চলে আসতেছে। পরে আব্বু আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে যাও তুমি আজ থেকে যেমন চাইবে, তেমনই পাবে। আর আম্মু বলল যাও তোমার আপুকে ধন্যবাদ দিয়ে আস। তখন মনে মনে ভাবলাম আসলেই তুমি আমার লক্ষ্মী আপু।  মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করি আমার মা-বাবাকে নেক হায়াৎ দান করুক। এছাড়া আমার লক্ষ্মী আপুর জন্য অনেক অনেক দোয়া ও ভালোবাসা রইল।

লেখক: মো: আরমান
শিক্ষার্থী, দশম শ্রেণি, পেকুয়া সরকারি মডেল জি এম সি ইনষ্টিটিউশন, কক্সবাজার

“ভয়েস অফ হ্যালো”র ফেসবুক ক্লিক করুন
“ভয়েস অফ হ্যালো”র ইউটিউব ক্লিক করুন

[শিশুরাই তুলে ধরবে শিশুদের অধিকারের কথা, আপনিও লিখুন আপনার কথা। লেখা পাঠানোর ঠিকানা [email protected]]

Comments are closed.